ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজয়ের এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে শুরু হয়নি। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার সমুদ্রবক্ষে জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা।
সমুদ্রসীমা জয়ের পর প্রথমবারের মতো উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) নীতিমালার আওতায় গভীর ও অগভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে সংস্থাটি। পিএসসি অনুযায়ী কোনো ব্লকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস বা তেলের সন্ধান মিললে সেখান থেকে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ থাকবে।
এর আগে ২০২৪ সালের মার্চে পেট্রোবাংলা দরপত্র আহ্বান করলে সাতটি বহুজাতিক কোম্পানি আগ্রহ দেখিয়ে দরপত্রের নথি সংগ্রহ করেছিল। তবে সময় বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দেয়নি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে সংশোধন করা হয়েছে পিএসসি, যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য চুক্তিটি এখন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন পিএসসিতে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, পাইপলাইন ট্যারিফ সুবিধা, নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সুবিধা আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।
পিএসসি মূল্যায়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, “শুধু দরপত্র আহ্বান করলেই হবে না, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। বর্তমান চুক্তিটি যথেষ্ট আকর্ষণীয়। কোনো বিদেশি কোম্পানি গ্যাসের সন্ধান পেলে তারা যেমন লাভবান হবে, তেমনি বাংলাদেশও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।”
তবে সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা ছয় মাস। এরপর দরপত্র মূল্যায়ন, আলোচনা ও চুক্তি সম্পন্ন করতে সময় লাগতে পারে প্রায় এক বছর। অনুসন্ধান কার্যক্রম চলবে আরও ৬ থেকে ৯ বছর। পাশাপাশি উৎপাদিত গ্যাস বা তেল স্থলভাগে আনার জন্য পাইপলাইন নির্মাণেও লাগতে পারে প্রায় দুই বছর।
ফলে সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলেও বঙ্গোপসাগরের তলদেশে সম্ভাব্য জ্বালানি সম্পদ দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে শুরু করতে অপেক্ষা করতে হতে পারে প্রায় এক দশক।
বর্তমান পিএসসি অনুযায়ী, কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে সেখানে ২৫ বছর এবং তেলক্ষেত্র পাওয়া গেলে ২০ বছর পর্যন্ত বাণিজ্যিক উৎপাদন চালানো যাবে। প্রয়োজন ও সম্ভাবনা বিবেচনায় এই সময়সীমা আরও ১০ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।



