আমেরিকা ও ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতা কোনো একক চুক্তি, সাময়িক সমঝোতা কিংবা মার্কিন প্রশাসনের পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা তার পরবর্তী যেকোনো প্রেসিডেন্টের মেয়াদের চেয়েও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের মূল কারণ ইরানের বৈপ্লবিক আদর্শ এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কৌশলগত অবস্থান।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জ্যেষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক ব্রেট এইচ. ম্যাকগার্কের মূল্যায়নে উঠে এসেছে এমনই বাস্তবতা। তার মতে, কোনো রাষ্ট্র যখন দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক লক্ষ্যকে রাষ্ট্রনীতির অংশ করে নেয় এবং তা বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে সংঘাতের পথ বেছে নেয়, তখন সেই রাষ্ট্রকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ থাকে না। গত প্রায় ৪৭ বছর ধরে ইরানের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেখা যায়নি।
বদলায় কৌশল, বদলায় না সংকট
হোয়াইট হাউসে নতুন প্রশাসন এলেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় নতুন বিতর্ক শুরু হয়। ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেন। বারাক ওবামা প্রশাসনের পরমাণু চুক্তিকে তারা যুদ্ধ এড়ানোর কার্যকর পথ হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ এবং সামরিক প্রতিরোধকে বেশি গুরুত্ব দেন।
তবে বাস্তবে দুই পক্ষের কোনো কৌশলই ইরানের বৈপ্লবিক চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারেনি।
আইআরজিসি ও বিপ্লবী আদর্শ
ইরানের সংবিধানে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে শুধু সামরিক বাহিনী হিসেবে রাখা হয়নি; তাদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে আদর্শিক দায়িত্বও। তেহরান এই বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তার, অঞ্চল থেকে মার্কিন উপস্থিতি কমানো এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
১৯৭৯ সালের মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকট থেকে শুরু করে বর্তমানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক গঠন—সবকিছুর পেছনেই একই আদর্শিক ধারাবাহিকতা কাজ করছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
পরমাণু চুক্তি ও ব্যর্থ প্রত্যাশা
পশ্চিমা বিশ্ব একসময় আশা করেছিল, অর্থনৈতিক সুবিধা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ পেলে ইরানের কঠোর বিপ্লবী অবস্থান কিছুটা নরম হতে পারে। সেই লক্ষ্যেই ওবামা প্রশাসন ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি সম্পন্ন করেছিল।
চুক্তিটি সাময়িকভাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত করলেও তেহরানের আঞ্চলিক নীতিতে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বরং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পর অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়ে ইরান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে বলে পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
৭ অক্টোবর হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের নজিরবিহীন হামলাকে বিশ্লেষকরা ইরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। বহু বছর ধরে ইরানের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পাওয়া হামাস ওই হামলার পর এটিকে ‘প্রতিরোধের সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরে।
এরপর ইয়েমেনের হুথি, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাক-সিরিয়ার বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী একযোগে ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে বহু-মাত্রিক চাপ সৃষ্টির ইরানি কৌশল আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানেও স্থায়ী পরিবর্তন নয়
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। কুদস ফোর্স প্রধান কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা এবং ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত ছিল তার প্রশাসনের সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ।
এসব অভিযানে কিছু কৌশলগত সাফল্য এলেও সামগ্রিকভাবে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতাকে চাপের মুখে ফেললেও দেশটির কট্টরপন্থী শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে।
সহজ সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং নতুন করে সম্ভাব্য পরমাণু চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা ও দরকষাকষির গুঞ্জন রয়েছে। তবে একই সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির কঠোর বক্তব্য এবং হরমুজ প্রণালিতে আইআরজিসির নতুন করে মাইন স্থাপনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন না এলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, সাময়িক যুদ্ধবিরতি এবং নতুন সংঘাতের এই চক্র চলতেই থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here